গল্পঃ ব্লাইন্ড লাভ
ভর্তির পর অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে করতে সেই দিন এসেই গেল।কাল আমার ভার্সিটি লাইফের প্রথম দিন।আজ কে নবীন বরন । এই ফার্স্ট ফ্যামিলি ছাড়া বাইরে।এক দিকে যেমন ফ্যামিলির জন্য খারাপ লাগতে ছিল অন্যদিকে ভিতরে ভিতরে নবীন বরন নিয়ে কিছুটা উত্তেজনাও কাজ করতে ছিল।
আমি স্কুল কলেজ লাইফের কোথাও কোন ক্লাসে মনযোগ দিতে পারতাম না।এটা আমার না স্যারের ব্যর্থতা এটা নিয়ে কোন কালেই আমার ভাবার সময় হয়ে উঠেনি। তারই ধারাবাহিকতায় আজকেও আমি স্যারদের কথা শোনা বাদ দিয়ে মোবাইলে ফেসবুক চালাতে ছিলাম। হঠাত করে কে যেনো অন্তর বলে ডাক দিল। মনে হলো ডাকটা পিছন থেকেই এসেছে, তাই ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি আমার ঠিক পিছনেই বসা হলুদ জামা পরা একটি মেয়ে হাতে নাড়ছে।
কি খবর অন্তর ? কেমন আছিস?
সরি,আমি আপনাকে চিনতে পারতেছি না।
আরে অন্তর আমি মোনামি। ফেসবুক আইডি প্রিন্সেস মোনামি।
শীট, তোকে আমি চিনতেই পারি নাই।
তোর স্মৃতিশক্তি এতো খারাপ? তাইলে তুই রুয়েটে চান্স পেলি কেমনে? আমার কেমন জানি সন্দেহ হয়। হু হু ,কাহিনী কি বল?
ফালতু পেঁচাল বাদ রাখ।এখন বল,তুই কোন সাবজেক্ট নিলি?
হুম, আমি সিএসসি নিলাম আর তুই?
ইলেক্ট্রিক্যাল নিলাম আমি। অনেক দিন হল তুই ফেসবুকে নাই। শেষ কথা হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ৫ মাস আগে।
হুম, রুয়েটের রেজাল্টের পর বাবা অসুস্থ হয়ে যায়। বাবাকে দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়।আমিও সাথে চলে যাই।
ও আচ্ছা।এখন আঙ্কেল কেমন আছেন?
হুম, এখন ভাল।
যাই হোক তুই ইঞ্জিনিয়ারিং ভার্সিটিতে চান্স পেলে আমাকে খাওয়াবি, এটা কিন্তু কথা ছিল। তা কবে সেটা হবে শুনি?
তাই নাকি? কবে আমি তোকে এ কথা বলেছিলাম আমার তো মনে নাই।
ও আচ্ছা, এখন বুঝি এই কথা । ঠিক আছে ,আমার মনে থাকবে।
হি হি হি। ওকে যা মন খারাপ করিস না ভার্সিটিতে পড়াকালীন যে কোন এক সময়ে খাওয়াবো নে।
হুম বুঝছি,তুমি যে কেমন খাওয়াবা।এক কাজ কর তুই পিছন থেকে আমার পাশের সিটে এসে বস।এতে কথা বলতে সুবিধা হবে।পিছন ফিরে তোর সাথে কথা বলতে বলতে আমার ঘাড় প্রায় বেকে গেছে।
এরপর মোনামি এসে আমার ডান পাশের ফাকা সিটে বসল।অডিটোরিয়ামে পুরোটা সময় আমরা কথা বলতে বলতে কাটিয়ে দিলাম।অডিটোরিয়াম থেকে বের হয়ে নাম্বার একচেঞ্জ করে আমি আমার মেস আর ও ওর হলের দিকে যাত্রা করে।
কালকে ক্লাস এটা ভেবেই আমার মাথায় একটা বাজ পড়ল।সকালে ঘুম থেকে নিয়মিত ১২ টা ১ টায় উঠার আভ্যাস করে ফেলেছি ভর্তি পরীক্ষার পর এই কয়েক মাসের ছুটিতে।কিন্তু এখন থেকে রেগুলার আমাকে ৮ টার আগে উঠতে হবে,এটা ভাবতেই আমার মাথায় মনে হয় আকাশ ভেঙ্গে প্রল। ভার্সিটির ক্লাস এতো সকালে কেও দেয় নাকি ,আসলে এটা কেজি স্কুল না ভার্সিটি এটায় বুঝতে পারতেছি না।
সকালে উঠতে হবে তাই রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে গেলাম মোবাইলে অ্যালাম দিয়েছিলাম সাড়ে সাত টায় কিন্তু ঘুম থেকে উঠে দেখি বাজে ৮ টা ২০।ক্লাসের প্রথম দিনেই লেইট।দশটা বিশে মোনামিকে ফোন দিলাম।
কিরে,কই তুই?
এই তো ডিপার্টমেন্ট থেকে বের হলাম মাত্র। তুই কই?
আমি ক্যাফেতে যাচ্ছি।তুই ও চলে আয়।
ওকে,তবে তুই বাইরে দাড়া।আমার নয়তো ভয় লাগবে একা একা।
হা হা ।ওকে ম্যাম। আয় তাইলে তুই,আমি দাঁড়াইলাম।
হুম,বাই।
মোনামি আসার পর দুই জন এক সাথে ক্যাফেতে ঢুকার পর দেখি সবাই কেমন জানি ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে।আমাদের থোরাই ওইদিকে কেয়ার করার টাইম আছে। যে যার অর্ডার করে খুনসুটি আর খাওয়া চালিয়ে গেলাম।অন্যদিকে নজর দেয়ার টাইম কই আমাদের।
ক্লাস শেষে প্রায়ই আমরা পদ্মা গার্ডেনে যেতাম। প্রায় প্রতি সপ্তাহে একদিন করে হলেও বাইরে খেতে যেতাম কারন হল আর বাইরের হোটেলের খাবার খেয়ে অতিস্ট।
ক্যাম্পাসে আমরা মানিক জোড় হিসেবে খ্যাতি পেয়ে গেলাম অল্প দিনের মধ্যে।আমার ফোন অফ থাকলে আমার বন্ধুরা ওকে ফোন দিয়ে জানে আমি কোথাই আছি।
ওর কোন কিছুর দরকার পড়লেই সাথে আমাকে স্মরণ। অন্তর আমার এটা লাগবে, আমার ওটা লাগবে।
এভাবে চলতে চলতে কে কখন কার প্রেমে পরে বসি টেরও পাই নি। মুখ ফুটে কেউ কোন দিন ভালবাসার কথা বলি নি তবুও কেমনে জানি দুই জনই বিষয়টা বুঝতে পারি। আগে ছিলাম শুধু বন্ধু আর পরে হলাম বন্ধ প্রেমিক দুইটাই । ও আগে আমাকে যতটুকু খাটাতো এখন তো দেখি আরো বেশি খাটায় । প্রায়ই বাজার করে এল এইচে দিয়ে আসতে হয়। আমার এই অবস্থা দেখে আমার ক্লাসের মেয়েরা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করে । এটা উনাকে বলার পর উনার তো মনে হল এটা গায়েই লাগল না। এমনেই চলছিল দিনগুলো । কিভাবে যে চার বছর চলে গেল টের পেলাম না।
সাবস্ক্রাইব করুন:
দেখতে ভার্সিটি লাইফ প্রায় যখন শেষ হবার পথে তখন আমি মোনামির কথা আম্মুকে বলি। প্রথমে কিছুটা না করলেও ওকে দেখার পর আর না করে নি।
পাশ করার পর পর আমদের এঙ্গেসমেন্ট হয়ে যায়। এর তিন মাসের মধ্যে আমার জার্মানি যাবার স্কলারশিপ হয়ে যায়। ঠিক করা হল যে ,আমি যখন প্রথম বার দেশে আসবো তখন আমাদের বিয়ে হবে।
অবশেষে আমার স্বপ্নের জার্মানিতে আমি। প্রথম দিকে এসে একবারে ভালোই লাগতো না কিছুই। সবাইকে খুব মিস করতাম। ধীরে ধীরে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিলাম।
জার্মানি আসার পরও মোনামির সাথে আমার ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলে চলতেই থাকলো ।আগে শুধু মোবাইলে কথা বলতাম আর এখন তো স্কাইপি তে কথা বলি।
দিনগুলি খুব ভালোই কাটছিল। দেখতে ৫ মাস হয়ে গেছে আমি জার্মানি আসছি। হটাৎ করে একদিন আম্মার ফোন। বলল , মোনামি খুব অসুস্থ্য ।হাঁসপাতালে ভর্তি। আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল হটাৎ করে ।তিন চার ঘন্টা আগে ওর সাথে যখন কথা হল , তখন তো সবই ঠিক ছিল ।
এদিকে আজকে আমার ফাস্ট থিসিসের প্রেজেনটেশান দেবার লাস্ট ডে । কিন্তু আমি তো মোনামির এই অবস্থা শুনে আমার হাত পা তো জমে বরফ।
অনবরত আমি আম্মুকে ফোন দিয়ে মোনামির খবর নিতেছিলাম। আম্মুর সাথে কথা বলার সময় মনে হল , আম্মু কি যেন একটা জিনিস আমার কাছে লুকাচ্ছে। পরে আব্বুকে ফোন দিলাম । আর যাই হোক আব্বু আমার সাথে কিছু লুকাতে পারবে না আমি নিশ্চিত। আব্বুর সাথে কথা বলার পর বুঝতে পারি যে, মোনামির অবস্থা খুব একটা ভাল না । ফোন রাখার সাথে সাথেই আমি ডরমিটরি থেকে পাসপোর্ট আর ছোট খাটো একটা ব্যাগ নিয়ে আমি এয়ারপোর্ট এর উদ্দেশ্যে বের হয়ে পড়ি।
দীর্ঘ প্রায় ৯ ঘন্টা জার্নি করে ঢাকায় পা রাখি। আব্বু আগে থেকেই আমার জন্য গাড়ী নিয়ে অপেক্ষায় ছিল । এয়ারপোর্ট থেকে সোজা হাঁসপাতালে গেলাম। আব্বু জানলো , মোনামিকে একটু আগে কেবিনে আনা হয়েছে।তবে এখনও জ্ঞান ফিরে নি। আমি কেবিনে ঢুকার সাথে সাথে লিনার মা আমাকে জড়িয়ে কান্না শুরু করে ।আর নিজেকে ধরে রাখতে পারতেছিলাম না। বুক ফেটে চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করতেছিল । কিন্তু আমি কাঁদতেও পারছি না ।
আরও ৪ ঘণ্টা পর মোনামির জ্ঞান ফেরে । আমাকে তার পাশে দেখে ম্লান একটা হাসি দেয়। আমি তার হাতটা ধরে বসে থাকি। এরপর ডাক্তারের সাথে কথা বলার পর আমার সাজনো পৃথিবীটা এক মুহূর্তেই ভেঙ্গে গেল । লিনার ব্রেন ক্যান্সার তাও সেটা লাস্ট পর্যায়ে ।এখন আর কোন ট্রিটমেন্ট কাজ করবে না। বড়জোড় এক মাস সময় আছে হাতে। মোনামি আর মাত্র এক মাস আছে আমাদের মাঝে , এই কথাটা আমি কিছুতেই মানতে পারতেছিলাম না। ধপ করে আমি ফ্লোরে বসে পড়ি। আমার সব কিছু যেন এক মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেল। এরপর আর আমার হুঁশ নেই । জ্ঞান ফেরার পর দেখি যে , আমি বাসায় আর সামনে আম্মা বসে আছে। সাথে সাথে আমি বিছানা থেকে উঠতে চেষ্টা করলে আম্মু বাঁধা দেয়।
তুমি অনেক জার্নি করে আসছো আর আর তুমি এখন অনেকটা দুর্বল ;পরে নাহয় যেয় এখন রেস্ট নাউ।
আম্মু, মোনামি আর মাত্র এক মাস বেঁচে আছে। আমি কি করে ওকে ছাড়া থাকবো? আমি চাই না ও আমাকে ছেড়ে একটা মুহূর্ত কাটাক ।
ওখানে তো সবাই আছে। তুমি একটু পরে যাও।
না , আম্মু । আমাকে যেতেই হবে ।
এটা বলেই রুম থেকে বের হয়ে সোজা হাঁসপাতালে গেলাম । যেয়ে দেখি মোনামি ঘুমাচ্ছে। ওর মলিন মুখটার দিকে তাকিয়ে আমার বুক ফেটে কান্না আসছিল।
২ দিন মোনামিকে হাঁসপাতাল থেকে ডিসচার্জ করে দেয়া হল । লিনা শেষ কয়েকটা দিন যেন স্বপ্নের মত কাটে আর আমি যেন কিছু স্মৃতি যা দিয়ে বাকি জীবন অনায়েশে কাটিয়ে দেয়া যাবে তাই দুই ফ্যামিলিকে অনেকটা জোর করে রাজী করলাম আমাদের বিয়ের কাজটা শেষ করার জন্য।
বিয়ে শেষে হানিমুনের জন্য আমরা কক্সবাজার গেলাম । আমাদের হানিমুন নিয়ে মোনামির কত স্বপ্ন ছিল যে ইতালি যাবে। কিন্তু প্লেন জার্নি ওর জন্য ঠিক হবে না ভেবেই এই কক্সবাজার আসা।
হোটেলের ব্যালকনিতে বসে আছি আমি আর মোনামি । মোনামির মাথাটা আমার কাঁধে ।
জানো অন্তর , আমার অনেক স্বপ্ন ছিল তোমার সাথে বসে এভাবে সমুদ্র দেখব, জ্যোৎস্না দেখব। আমাদের একটা ফুটফুটে বাচ্চা হবে ।কিন্তু আমার স্বপ্ন গুলো শুধুই স্বপ্নই থেকে গেল ।
এটা বলে ও আমাকে জড়িয়ে কাঁদতে শুরু করে । আমি ওকে যে সান্ত্বনা দিব সে ভাষাও আমার জানা নেই। আমি কেবল দূর আকাশের দিকে অন্ধকারের মাঝে তাকিয়ে কান্না গোপনের চেষ্টা করলাম।
দেখতে দেখতে সময় ফুরিয়ে গেল। তারপর... ...... ......
দশ বছর পর,
আবার আমি সেই কক্সবাজারে । জ্যোৎস্না রাতে হোটেলের ব্যালকনিতে বসে আছি। সমুদ্রের গর্জন শোনা যাচ্ছে। টেবিলের উপর একটা কেক রাখা। কারন আজ লিয়ার জন্ম দিন । প্রতি বছর আমি এই দিনটা এখানেই উৎযাপন করি । সব কিছুই আছে কিন্তু শুধু সে নেই ।
সাবস্ক্রাইব করুন:
By khandaker salman
আমি স্কুল কলেজ লাইফের কোথাও কোন ক্লাসে মনযোগ দিতে পারতাম না।এটা আমার না স্যারের ব্যর্থতা এটা নিয়ে কোন কালেই আমার ভাবার সময় হয়ে উঠেনি। তারই ধারাবাহিকতায় আজকেও আমি স্যারদের কথা শোনা বাদ দিয়ে মোবাইলে ফেসবুক চালাতে ছিলাম। হঠাত করে কে যেনো অন্তর বলে ডাক দিল। মনে হলো ডাকটা পিছন থেকেই এসেছে, তাই ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি আমার ঠিক পিছনেই বসা হলুদ জামা পরা একটি মেয়ে হাতে নাড়ছে।
কি খবর অন্তর ? কেমন আছিস?
সরি,আমি আপনাকে চিনতে পারতেছি না।
আরে অন্তর আমি মোনামি। ফেসবুক আইডি প্রিন্সেস মোনামি।
শীট, তোকে আমি চিনতেই পারি নাই।
তোর স্মৃতিশক্তি এতো খারাপ? তাইলে তুই রুয়েটে চান্স পেলি কেমনে? আমার কেমন জানি সন্দেহ হয়। হু হু ,কাহিনী কি বল?
ফালতু পেঁচাল বাদ রাখ।এখন বল,তুই কোন সাবজেক্ট নিলি?
হুম, আমি সিএসসি নিলাম আর তুই?
ইলেক্ট্রিক্যাল নিলাম আমি। অনেক দিন হল তুই ফেসবুকে নাই। শেষ কথা হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ৫ মাস আগে।
হুম, রুয়েটের রেজাল্টের পর বাবা অসুস্থ হয়ে যায়। বাবাকে দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়।আমিও সাথে চলে যাই।
ও আচ্ছা।এখন আঙ্কেল কেমন আছেন?
হুম, এখন ভাল।
যাই হোক তুই ইঞ্জিনিয়ারিং ভার্সিটিতে চান্স পেলে আমাকে খাওয়াবি, এটা কিন্তু কথা ছিল। তা কবে সেটা হবে শুনি?
তাই নাকি? কবে আমি তোকে এ কথা বলেছিলাম আমার তো মনে নাই।
ও আচ্ছা, এখন বুঝি এই কথা । ঠিক আছে ,আমার মনে থাকবে।
হি হি হি। ওকে যা মন খারাপ করিস না ভার্সিটিতে পড়াকালীন যে কোন এক সময়ে খাওয়াবো নে।
হুম বুঝছি,তুমি যে কেমন খাওয়াবা।এক কাজ কর তুই পিছন থেকে আমার পাশের সিটে এসে বস।এতে কথা বলতে সুবিধা হবে।পিছন ফিরে তোর সাথে কথা বলতে বলতে আমার ঘাড় প্রায় বেকে গেছে।
এরপর মোনামি এসে আমার ডান পাশের ফাকা সিটে বসল।অডিটোরিয়ামে পুরোটা সময় আমরা কথা বলতে বলতে কাটিয়ে দিলাম।অডিটোরিয়াম থেকে বের হয়ে নাম্বার একচেঞ্জ করে আমি আমার মেস আর ও ওর হলের দিকে যাত্রা করে।
কালকে ক্লাস এটা ভেবেই আমার মাথায় একটা বাজ পড়ল।সকালে ঘুম থেকে নিয়মিত ১২ টা ১ টায় উঠার আভ্যাস করে ফেলেছি ভর্তি পরীক্ষার পর এই কয়েক মাসের ছুটিতে।কিন্তু এখন থেকে রেগুলার আমাকে ৮ টার আগে উঠতে হবে,এটা ভাবতেই আমার মাথায় মনে হয় আকাশ ভেঙ্গে প্রল। ভার্সিটির ক্লাস এতো সকালে কেও দেয় নাকি ,আসলে এটা কেজি স্কুল না ভার্সিটি এটায় বুঝতে পারতেছি না।
সকালে উঠতে হবে তাই রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে গেলাম মোবাইলে অ্যালাম দিয়েছিলাম সাড়ে সাত টায় কিন্তু ঘুম থেকে উঠে দেখি বাজে ৮ টা ২০।ক্লাসের প্রথম দিনেই লেইট।দশটা বিশে মোনামিকে ফোন দিলাম।
কিরে,কই তুই?
এই তো ডিপার্টমেন্ট থেকে বের হলাম মাত্র। তুই কই?
আমি ক্যাফেতে যাচ্ছি।তুই ও চলে আয়।
ওকে,তবে তুই বাইরে দাড়া।আমার নয়তো ভয় লাগবে একা একা।
হা হা ।ওকে ম্যাম। আয় তাইলে তুই,আমি দাঁড়াইলাম।
হুম,বাই।
মোনামি আসার পর দুই জন এক সাথে ক্যাফেতে ঢুকার পর দেখি সবাই কেমন জানি ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে।আমাদের থোরাই ওইদিকে কেয়ার করার টাইম আছে। যে যার অর্ডার করে খুনসুটি আর খাওয়া চালিয়ে গেলাম।অন্যদিকে নজর দেয়ার টাইম কই আমাদের।
ক্লাস শেষে প্রায়ই আমরা পদ্মা গার্ডেনে যেতাম। প্রায় প্রতি সপ্তাহে একদিন করে হলেও বাইরে খেতে যেতাম কারন হল আর বাইরের হোটেলের খাবার খেয়ে অতিস্ট।
ক্যাম্পাসে আমরা মানিক জোড় হিসেবে খ্যাতি পেয়ে গেলাম অল্প দিনের মধ্যে।আমার ফোন অফ থাকলে আমার বন্ধুরা ওকে ফোন দিয়ে জানে আমি কোথাই আছি।
ওর কোন কিছুর দরকার পড়লেই সাথে আমাকে স্মরণ। অন্তর আমার এটা লাগবে, আমার ওটা লাগবে।
এভাবে চলতে চলতে কে কখন কার প্রেমে পরে বসি টেরও পাই নি। মুখ ফুটে কেউ কোন দিন ভালবাসার কথা বলি নি তবুও কেমনে জানি দুই জনই বিষয়টা বুঝতে পারি। আগে ছিলাম শুধু বন্ধু আর পরে হলাম বন্ধ প্রেমিক দুইটাই । ও আগে আমাকে যতটুকু খাটাতো এখন তো দেখি আরো বেশি খাটায় । প্রায়ই বাজার করে এল এইচে দিয়ে আসতে হয়। আমার এই অবস্থা দেখে আমার ক্লাসের মেয়েরা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করে । এটা উনাকে বলার পর উনার তো মনে হল এটা গায়েই লাগল না। এমনেই চলছিল দিনগুলো । কিভাবে যে চার বছর চলে গেল টের পেলাম না।
সাবস্ক্রাইব করুন:
পাশ করার পর পর আমদের এঙ্গেসমেন্ট হয়ে যায়। এর তিন মাসের মধ্যে আমার জার্মানি যাবার স্কলারশিপ হয়ে যায়। ঠিক করা হল যে ,আমি যখন প্রথম বার দেশে আসবো তখন আমাদের বিয়ে হবে।
অবশেষে আমার স্বপ্নের জার্মানিতে আমি। প্রথম দিকে এসে একবারে ভালোই লাগতো না কিছুই। সবাইকে খুব মিস করতাম। ধীরে ধীরে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিলাম।
জার্মানি আসার পরও মোনামির সাথে আমার ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলে চলতেই থাকলো ।আগে শুধু মোবাইলে কথা বলতাম আর এখন তো স্কাইপি তে কথা বলি।
দিনগুলি খুব ভালোই কাটছিল। দেখতে ৫ মাস হয়ে গেছে আমি জার্মানি আসছি। হটাৎ করে একদিন আম্মার ফোন। বলল , মোনামি খুব অসুস্থ্য ।হাঁসপাতালে ভর্তি। আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল হটাৎ করে ।তিন চার ঘন্টা আগে ওর সাথে যখন কথা হল , তখন তো সবই ঠিক ছিল ।
এদিকে আজকে আমার ফাস্ট থিসিসের প্রেজেনটেশান দেবার লাস্ট ডে । কিন্তু আমি তো মোনামির এই অবস্থা শুনে আমার হাত পা তো জমে বরফ।
অনবরত আমি আম্মুকে ফোন দিয়ে মোনামির খবর নিতেছিলাম। আম্মুর সাথে কথা বলার সময় মনে হল , আম্মু কি যেন একটা জিনিস আমার কাছে লুকাচ্ছে। পরে আব্বুকে ফোন দিলাম । আর যাই হোক আব্বু আমার সাথে কিছু লুকাতে পারবে না আমি নিশ্চিত। আব্বুর সাথে কথা বলার পর বুঝতে পারি যে, মোনামির অবস্থা খুব একটা ভাল না । ফোন রাখার সাথে সাথেই আমি ডরমিটরি থেকে পাসপোর্ট আর ছোট খাটো একটা ব্যাগ নিয়ে আমি এয়ারপোর্ট এর উদ্দেশ্যে বের হয়ে পড়ি।
দীর্ঘ প্রায় ৯ ঘন্টা জার্নি করে ঢাকায় পা রাখি। আব্বু আগে থেকেই আমার জন্য গাড়ী নিয়ে অপেক্ষায় ছিল । এয়ারপোর্ট থেকে সোজা হাঁসপাতালে গেলাম। আব্বু জানলো , মোনামিকে একটু আগে কেবিনে আনা হয়েছে।তবে এখনও জ্ঞান ফিরে নি। আমি কেবিনে ঢুকার সাথে সাথে লিনার মা আমাকে জড়িয়ে কান্না শুরু করে ।আর নিজেকে ধরে রাখতে পারতেছিলাম না। বুক ফেটে চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করতেছিল । কিন্তু আমি কাঁদতেও পারছি না ।
আরও ৪ ঘণ্টা পর মোনামির জ্ঞান ফেরে । আমাকে তার পাশে দেখে ম্লান একটা হাসি দেয়। আমি তার হাতটা ধরে বসে থাকি। এরপর ডাক্তারের সাথে কথা বলার পর আমার সাজনো পৃথিবীটা এক মুহূর্তেই ভেঙ্গে গেল । লিনার ব্রেন ক্যান্সার তাও সেটা লাস্ট পর্যায়ে ।এখন আর কোন ট্রিটমেন্ট কাজ করবে না। বড়জোড় এক মাস সময় আছে হাতে। মোনামি আর মাত্র এক মাস আছে আমাদের মাঝে , এই কথাটা আমি কিছুতেই মানতে পারতেছিলাম না। ধপ করে আমি ফ্লোরে বসে পড়ি। আমার সব কিছু যেন এক মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেল। এরপর আর আমার হুঁশ নেই । জ্ঞান ফেরার পর দেখি যে , আমি বাসায় আর সামনে আম্মা বসে আছে। সাথে সাথে আমি বিছানা থেকে উঠতে চেষ্টা করলে আম্মু বাঁধা দেয়।
তুমি অনেক জার্নি করে আসছো আর আর তুমি এখন অনেকটা দুর্বল ;পরে নাহয় যেয় এখন রেস্ট নাউ।
আম্মু, মোনামি আর মাত্র এক মাস বেঁচে আছে। আমি কি করে ওকে ছাড়া থাকবো? আমি চাই না ও আমাকে ছেড়ে একটা মুহূর্ত কাটাক ।
ওখানে তো সবাই আছে। তুমি একটু পরে যাও।
না , আম্মু । আমাকে যেতেই হবে ।
এটা বলেই রুম থেকে বের হয়ে সোজা হাঁসপাতালে গেলাম । যেয়ে দেখি মোনামি ঘুমাচ্ছে। ওর মলিন মুখটার দিকে তাকিয়ে আমার বুক ফেটে কান্না আসছিল।
২ দিন মোনামিকে হাঁসপাতাল থেকে ডিসচার্জ করে দেয়া হল । লিনা শেষ কয়েকটা দিন যেন স্বপ্নের মত কাটে আর আমি যেন কিছু স্মৃতি যা দিয়ে বাকি জীবন অনায়েশে কাটিয়ে দেয়া যাবে তাই দুই ফ্যামিলিকে অনেকটা জোর করে রাজী করলাম আমাদের বিয়ের কাজটা শেষ করার জন্য।
বিয়ে শেষে হানিমুনের জন্য আমরা কক্সবাজার গেলাম । আমাদের হানিমুন নিয়ে মোনামির কত স্বপ্ন ছিল যে ইতালি যাবে। কিন্তু প্লেন জার্নি ওর জন্য ঠিক হবে না ভেবেই এই কক্সবাজার আসা।
হোটেলের ব্যালকনিতে বসে আছি আমি আর মোনামি । মোনামির মাথাটা আমার কাঁধে ।
জানো অন্তর , আমার অনেক স্বপ্ন ছিল তোমার সাথে বসে এভাবে সমুদ্র দেখব, জ্যোৎস্না দেখব। আমাদের একটা ফুটফুটে বাচ্চা হবে ।কিন্তু আমার স্বপ্ন গুলো শুধুই স্বপ্নই থেকে গেল ।
এটা বলে ও আমাকে জড়িয়ে কাঁদতে শুরু করে । আমি ওকে যে সান্ত্বনা দিব সে ভাষাও আমার জানা নেই। আমি কেবল দূর আকাশের দিকে অন্ধকারের মাঝে তাকিয়ে কান্না গোপনের চেষ্টা করলাম।
দেখতে দেখতে সময় ফুরিয়ে গেল। তারপর... ...... ......
দশ বছর পর,
আবার আমি সেই কক্সবাজারে । জ্যোৎস্না রাতে হোটেলের ব্যালকনিতে বসে আছি। সমুদ্রের গর্জন শোনা যাচ্ছে। টেবিলের উপর একটা কেক রাখা। কারন আজ লিয়ার জন্ম দিন । প্রতি বছর আমি এই দিনটা এখানেই উৎযাপন করি । সব কিছুই আছে কিন্তু শুধু সে নেই ।
সাবস্ক্রাইব করুন: