গল্পঃ একটি চিঠির প্রেক্ষাপট

আমরা তখন থাকতাম চট্টগ্রামে। আব্বু রসায়নের শিক্ষক ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি কলেজের। সরকারী কোয়াটার পেয়েছিলেন থাকার জন্য। অনুরা থাকত আমাদের বিল্ডিংয়ের দোতলায়। অনুর আব্বু চাকরি করত আব্বুর সাথে। অনু আর আমি তখন চট্টগ্রাম সিটি কলেজিয়েট স্কুলে পড়তাম, কিন্তু অনু পড়ত আমার ছোট বোন হেনার সাথে, দুই ক্লাস জুনিয়র ছিল। জুনিয়র মেয়ে হলে কি হবে সারাক্ষন আমার ঘাড়ে বোঝার মত ঝুলে থাকত। কয়েকদিন ধরেই দেখতাম বাসায় কেমন জানি গুমোট পরিবেশ। আব্বা সকাল সকাল কলেজ থেকে চলে আসত। সন্ধ্যা সাতটা বাজলেই ভাঙ্গা রেডিওটা নিয়ে কি যেন শোনার জন্য অস্থির হয়ে উঠতেন। সন্ধ্যার পর বাসার বাইরে যেতে পারতাম না, শহরের দোকানগুলোও বন্ধ যেত। পাড়ার পান-বিড়ির দোকান গুলোও বন্ধ হয়ে যেত। সেদিন বাসায় গিয়ে দেখি ভাঙ্গা রেডিওটাকে মাঝখানে রেখে সবাই গভীর মনোযোগে কি যেন শুনছে। অনুও বসে আছে তার মা-বাবার সাথে। কি এমন অনুষ্ঠান দিচ্ছে রেডিওতে? সবার মুখে এমন ভয় কিসের? অনু মেয়েটাই বা কেন এখানে বসে আছে? যে মেয়ে কোন বাহানা পেলেই আমার রুমে ঢুকে পড়ে এমনকি আমি না থাকলেও। সেবার তো বেশ ভালো রকম বিপদে পড়েছিলাম। রুমে ঢুকে দেখি অনু আমার সিগারেটের প্যাকেট খুঁজে বের করে ফেলেছে। স্কুল পালিয়ে ছবির শো দেখিয়ে তবে মাফ পেয়েছিলাম। আমাকে দেখেই আম্মা কেমন যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো বলে মনে হল।

-‘কোথায় ছিলি এতক্ষন?’ অনেকটা উগ্বিগ্নভরা কন্ঠেই জানতে চাইল আম্মা।
-‘নেসারদের বাসায় গেছিলাম।’
খবরটা শেষ হলেই অনুর আব্বার গলা শুনতে পাই। ‘অনুদের এখন বাড়িতে রেখে আসাই ভালো। আজকে মিলিটারী এসেই শীল পাড়ায় গিয়ে রমন শীলকে মেরে তার বউ-মেয়েকে ধরে নিয়ে গেছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রওনা দিব।’ এতক্ষনে বুঝতে পারলাম চা-ওয়ালা এ কথাই বলছিল দোকানে। খেতে বসে দেখি সবার মনে কেমন যেন একটা থমথমে ভাব।
-‘আব্বা আমরাও কি অনুদের মত বাড়িতে চলে যাব?’
-‘না, মা এখন না আরও কয়েকটা দিন দেখি।’আব্বা হেনার মাথায় হাত বুলাতে লাগলেন। ‘কাল থেকে তোমাদের বাসার বাহিরে যাওয়ার দরকার নাই, বুঝেছো?
হেনা কেমন যেন কাঁদো কাঁদো গলায় জিজ্ঞাসা করল-‘আমরা কি স্কুলেও যাব না?’
-‘শুধু এখন না। আবার যাবে।’ হেনা কাদঁতে শুরু করলে আব্বা জড়িয়ে ধরে বলতে থাকেন-‘এই বাচ্চা মেয়ে কাঁদে কেন। তুমি তো আবার স্কুলে যাবে; না হলে আমার মামণি ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করবে কিভাবে?’

সাবস্ক্রাইব করুন:

পরের দুই দিন বাসা থেকে একদম বের হতে পারলাম না, শুধুমাত্র দুইবার পালিয়ে নেসারদের বাড়িতে গিয়েছিলাম। নেসারের বড় ভাই ঢাকায় চাকরী করত। মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিতে যাবে বলে মায়ের সাথে দেখা করার জন্য বাড়িতে এসেছিলন, কারও কানে যেন সে কথা না যায় তার জন্য কারও কাছে উনার আসার খবর জানাতে নিষেধ করেছিলেন; এমনকি ফজিলা আপাকে জানাতেও মানা করে দিয়েছিলেন। সেদিনের সন্ধ্যাটা অন্য কোন সন্ধ্যার চেয়ে ভিন্ন ছিল না। সন্ধ্যাটা অন্ধকার রাতের আগমনী বার্তাই ধরেছিলাম কিন্তু সেদিনের সন্ধ্যাটা অন্ধকার জীবনেরও আগমনী বার্তা নিয়ে এসেছিল। হঠাৎ করেই বাসার সামনেই দেখি মিলিটারী জিপ। জিপ থেকে দেখি দশ-বারোজনের একটা দলের দরজায় কড়াঘাতের নিদারুণ শব্দ। পিছনের জানালা দিয়ে আমরা সবাই পালিয়ে যাওয়ার সময় দেখি অনুর আব্বা অনুকে কাঁধে নিয়ে শাড়ি বেয়ে দোতলা থেকে নামছে। পুকুরের পাড়ে ঘন ঝোপটায় যখন আমরা সবাই লুকিয়ে আছি, হঠাৎ করে অনুর আম্মার মনে পড়ে ইয়াসিরের কথা। ইয়াছির ছিল অনুর ছোট ভাই, দেড় বছরের; ঘুমিয়ে থাকায় তার কথা কারও মনে পড়ে নি। খালা ইয়াছিরকে ফেরত আনতে চাইলে, খালু বাধা দেন সবার জীবন বাচাঁনোর জন্য। সেদিন ঝোপটায় আমরা সারাটা রাত কাটিয়েছিলাম। ফজরের আজান দিলে আমরা সবাই বাসায় এসে দেখি সব তছনছ হয়ে পড়ে আছে। ভাগ্যো ভালো ছিলো বিধায় সেবার ইয়াছিরকে জীবিত ফেরত পেয়েছিলাম, ইয়াছির তখনো ঘুমিয়ে ছিল। দুপুরে অনুকে দেখি দরজায় দাড়িয়ে আছে।

-‘কি আজ আসবি না রুমে?’
-‘আমরা চলে যাচ্ছি। আব্বা নৌকা ঠিক করতে গেছে। তোমার রুমে আর তোমাকে জ্বালাতন করতে আসবো না। আমাকে আর স্কুল পালিয়ে ছবি দেখাতে নিয়ে যেতে হবে না’
চোখে জল অথচ হাসি মুখেই কথাটা বলে দৌড়ে চলে গেল অনু।


অনুরা চলে যাবার পর বিকালে হঠাৎ করে মিলিটারী জিপ দেখতে পেলাম আবার। আব্বা আমাদের সবাইকে আবার ঝোপে লুকিয়ে থাকতে বললেন-‘সালেহা, আমার কসম লাগে তুমি বাচ্চাদের নিয়ে লুকিয়ে পড়ো। আমার কিছু হবে না। যা কিছুই ঘটুক তুমি ঝোপ থেকে বের হবে না।’ আমি, আম্মা, হেনা আর ফরিদ ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে থেকে দেখি আাব্বুকে আসলাম সরকার সহ রক্তপিপাসু হানাদার বাহিনী বুটের আঘাতে দুমড়ে-মুচড়ে ফেলতে চাইছে। হেনা চিৎকার করতে গেলে আম্মা ফরিদকে আমার কোলে দিয়ে হেনার মুখ হাত দিয়ে আটকে রেখে জড়িয়ে ধরেন। প্রায় একঘন্টা পর নরপিশাচগুলো চলে গেলে বাসায় ঢুকতেই দেখি আব্বু মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে আছে; নাক-মুখ দিয়ে অবিরত রক্ত ঝরছে। চশমাটা ভেঙ্গে চূর্ণ-বিচূর্ণ।

এক সপ্তাহ পর আব্বু সুস্থ হয়ে উঠলে ঠিক হয় পরদিন ভোরেই আমরা কুমিল্লা চলে যাব। মতিন মামা কাল সকালে গাড়ি নিয়ে এসে আমাদের কুমিল্লায় তার বন্ধুর বাসায় নিয়ে যাব। তারপর কুমিল্লা থেকে আগরতলা চলে যাব। এই পুরোটা সপ্তাহ জুড়ে রেডিওতে শুনতে থাকি সারাদেশে নরপশুদের পৈশাচিক হত্যালীলার খবর আর স্থানীয়দের কাছে শুনতে পাই আসলাম সরকারের সহায়তায় বর্বরদের অত্যাচারের খবর। কুমিল্লায় যাওয়ার কথা মেনে নিতে পারলেও দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা কেন জানি মেনে নিতে পারলাম না। মনের ভিতর কিসের যেন বিদ্রোহ ঘোষণা। সেদিন রাতেই সিদ্ধান্ত নিলাম যে হানাদার বাহিনীর কারনে আজ আমাদের দেশ ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে তাদের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করবই। রাতে নেসারদের বাসায় গেলাম শফিক ভাইয়ের খোঁজে।
-‘নেসার, শফিক ভাই কি আছে?
-‘আছে, ক্যারে? ভিতরে আয়।’
শফিক ভাইয়ের রুমে ঢুকতেই দেখি শফিক ভাই ব্যাগ ঘুছাচ্ছেন। আজ রাতেই চলে যাবেন মুক্তি বাহিনীতে।
-‘আরে ফারুক, কেমন আছো? তোমার আব্বা কেমন আছে?’
-‘জ্বি ভালো। শফিক ভাই আপনার সাথে কিছু কথা ছিলো। নেসার, তুই কি একটু বাইরে যাবি?’
নেসার রুম থেকে চলে গেলে শফিক ভাই কিছুটা অবাক হয়ে সিগারেটটা ধরিয়ে জানতে চাইল-‘কিছু বলবে?’
-‘আমিও আপনার সাথে মুক্তি বাহিনীতে যোগ দিতে চাই।’
-‘তুমি এখনও বাচ্চা ছেলে। যুদ্ধ বাচ্চাদের খেলনা নয়।’
-‘আমি এখন আর বাচ্চা না। আপনার মত আমিও সিগারেট খাই।’
-‘তুমি তোমার মা-বাবার বড় ছেলে। তুমি চলে গেলে তাদের দেখবে কে?’
-‘ফরিদ, নেসররা আছে। তারা দেখবে।’
-‘কিন্তু আমি আজ রাতেই চলে যাচ্ছি।’
-‘আমিও আজ রাতে যাব আপনার সাথে।’

সেদিন রাতেই কারও কাছ থেকে কোন বিদায় না নিয়ে এই চিঠি লিখে বাড়ি থেকে বেড়িয়েছিলাম বাবার অপমানের শোধ নিতে, দেশকে মুক্ত করতে, দেশের মানুষকে মুক্ত করতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী আর তাদের এদেশীয় দোসর আসলাম সরকারের মত হাজারো রাজাকারের হাত থেকে।
সাইফ-স্যার বর্তমান বাংলাদেশ নিয়ে আপনার অণুভূতি কি?
আজকে যখন পত্রিকা খুললে যেকোন শিক্ষক লাঞ্চিত হওয়ার খবর দেখি তখন মনে হয় আমারা যুদ্ধে এখনও জিততে পারিনি। আমরা পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে জয়লাভ করেছি কিন্তু আসলাম সরকারের মত রাজাকার, বিশ্বাসঘাতকদের বিরুদ্ধে এখনো আমরা জয়লাভ করতে পারিনি। আসলাম সরকারের বংশধরেরা আজও তাই শিক্ষকদের লাঞ্চিত করার সাহস পায়। আমাদের কমান্ডারের বয়স ছিল ৬০ বছর এবং সে সময় তিনি বলেছিলেন-‘আজকের আমি ভবিষৎ বংশধরের প্রথম সোপান।’ আজও নিজেকে আমার ৬০ বছরে তরুণ মনে হয়। আলোকিত ভবিষৎ এর প্রথম সোপান আমিই রচনা করব। যতক্ষন এ দেহে প্রাণ থাকবে, ততক্ষণ মুক্তির লড়াই চালিয়ে যাব।
সাইফ-স্যার, আপনি মৃত্যুর পরও যে আমাকে স্বপ্নে এসে সাক্ষাৎকার দিলেন তার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
ফারুক- তোমাকেও অনেক ধন্যবাদ।

সাবস্ক্রাইব করুন:

লেখকের কথাঃ- এ গল্পটাকে স্বপ্নে পাওয়া গল্প বলব। প্রথমা প্রকাশনের ‘একাত্তরের চিঠি’ বইটিতে ফারুক, পুরো নাম আমানউল্লাহ চৌধুরী ফারুক নামে ক্লাস টেন পড়ুয়া একজন শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধার চিঠি প্রকাশিত হয়েছিল। তার চিঠিটি যতবার পড়েছি ততবার চোখ জলে ভিজে গিয়েছিল। এমন বীর যোদ্ধার কোন ছবি দেখিনি তবুও তিনি আমার স্বপ্নে এসে হাজির হন। আর তখনই নেই এই সাক্ষাৎকারটি। পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারটিকে গল্পধর্মী সাক্ষাৎকারে রূপান্তরিত করা হয়েছে। আগেই বলেছি গল্পটি স্বপ্নে পাওয়া তাই এর সাথে বাস্তবের কোন মিল নেই বা মিল খুজঁতে যাওয়া অবান্তরের নামান্তর। আর একটি কথা ‘একাত্তরের চিঠি’ বইটি কারও সংগ্রহে না থাকলে জোগাড় করে চিঠিটি একবার হলেও পড়ে ফেলুন।
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url